এই সাইটের কোন লেখা কপি করা নিষেধ

সেলস ফানেল কি? সফলতার অন্যতম সিক্রেট লুকিয়ে আছে এই সেলস ফানেলে (১ম পর্ব)

যখন যেকোন বিষয়ে মার্কেটিংয়ের পরিকল্পনা শুরু করবেন, তখন ১ম পরিকল্পনা করবেন কিভাবে সেলস ফানেলটি তৈরি করবেন। বিশেষ করে যে মার্কেটিংয়ে সেল বিষয়টি যুক্ত রয়েছে, যেমন: কোন প্রতিষ্ঠানের কোন সার্ভিস সেল করবেন, কিংবা অ্যাফিলিয়েশনের জন্য মার্কেটিং পরিকল্পনা সাজিয়েছেন, কিংবা ইকমার্স বিজনেস করছেন, মার্কেটিং পরিকল্পনা সাজাচ্ছেন, সেক্ষেত্রে অবশ্যই সেলস ফানেল সাজিয়ে নিবেন। না হলে মার্কেটিং হবে, প্রোডাক্ট সেল হবেনা। সেল হলেও একটা পযায়ে সেল বন্ধ হয়ে যাবে।

এমনকি ব্লগের ট্রাফিক, ভিডিওতে ট্রাফিক আনার জন্য , রিয়েল লাইফের অনেক কিছুতেও (শিক্ষক হিসেবে ছাত্রের সমীহ আদায়, বস হিসেবে স্টাফের সমীহ আদায়, কিংবা প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে সফল হতে হলেও) সেলস ফানেলের সূত্র মাথাতে রাখতে হবে।

সেলস ফানেল কি?

একটা রিয়েল লাইফ উদাহরণ দিয়ে বুঝাই। বাসার পানির ট্যাংকি সবাই চিনেন। সেখানে মোটর দিয়ে ট্যাংকিতে পানি তুলছেন। পানিটা তুলছেন, মাটির নিচ থেকে কিংবা হয়ত ওয়াশার পানির পাইপ থেকে। এ পানি এসে জমছে ট্যাংকিতে। সেই পানি প্রতিটা ঘরের কল দিয়ে বের হচ্ছে বা পড়ছে। এ পুরো সিস্টেমটি হচ্ছে সেলস ফানেল।

যদি ট্যাংকিতে পানি তোলা না হতো, একসময় সব পানি শেষ হয়ে যেত। তাই একদিক দিয়ে সম্ভাব্য পানির বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে টেনে ট্যাংকিতে পানি ভরা হচ্ছে। যাকে মার্কেটিংয়ের ভাষাতে লিড বলি। সেই লিডগুলো ট্যাংকিতে স্টোর করা হয়েছে। এবার লিডগুলোকে প্রয়োজনের সময় সেলে কনর্ভাট করেছি, যা ঘরের কল দিয়ে বের হয়েছে।

যেকোন কিছুর মার্কেটিং প্লান করলে, সম্ভাব্য লিডগুলোকে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে বিভিন্ন উপায়ে কালেক্ট করে, নিজের কন্ট্রোলে কোন জায়গাতে স্টোর করতে হয়। তারপর সেগুলোকে নার্সিং করতে হয়। এগুলো নার্সিং করার কারনে সেগুলো সেলে কনর্ভাট হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। এবার যখন নিজের প্রোডাক্টকে তাদের কাছে বিক্রির জন্য উপস্থাপন করা হয়, তখন সেটা বিক্রির সম্ভাবনাটা বেড়ে যায়। এ পুরো প্রক্রিয়াটাকে প্লান মাফিক সাজানোকেই সেলস ফানেল বলে।

কেন সেলস ফানেল গুরুত্বপূর্ণ?

আবারো বুঝানোর সুবিধার্থে একটি রিয়েল লাইফ উদাহরণ দিয়ে  মার্কেটিংয়ের ক্ষেত্রে সেলস ফানেলটির গুরুত্ব বুঝানোর চেষ্টা করছি।

তিনটি চরিত্র কল্পনা করি এখানে। মিলি মোটামুটি সুন্দরী একজন মেয়ে। আসিফ অনেক হ্যান্ডসাম এবং যেকোন মেয়ের স্বপ্নের পুরুষ হওয়ার মত স্মার্ট একজন ছেলে। আজিম তার বন্ধু। দেখতে মোটেই সুন্দর না, চলাফেরাতেও একদমই আনস্মার্ট। দুইজনই মিলিকে নিয়ে স্বপ্ন দেখছে। আসিফ খুব স্মার্ট হওয়ার কারনে অনেক কনফিডেন্টের সাথেই মিলিকে গিয়ে ১ম সাক্ষাতেই সরাসরি প্রেমের প্রস্তাব করলো।

অপ্রত্যাশিতভাবে সাথে সাথে মিলির চপেটাঘাত তার মুখে এসে পড়লো। এর ২মাস পর আসিফ জানতে পারলো অসুন্দর, আনস্মার্ট বন্ধু আজিমের সাথে মিলির প্রেম শুরু হয়েছে ৭দিন হলো। বিষয়টি বিস্ময়কর। আনস্মার্ট একজন ছেলে মিলির প্রেম আদায় করে নিতে পারলো, কিন্তু আসিফ এত স্মার্ট, সুন্দর হওয়ার পরও তার প্রেম পেলোনা। কেন এখানে এরকম ঘটেছে, তার ব্যাখ্যাতেই জানতে পারবেন, সেলস ফানেলের প্রয়োজনীয়তা। ব্যাখ্যাটি জানতে আসিফ আজিমের কাছে গেলো। কিভাবে আজিম মিলিকে পেলো, শুনুন আজিমের মুখ থেকেই:

“আমি ১ম দেখাতেই সার্ভিস সেল করার প্রস্তাব করিনি অর্থাৎ প্রেমের অফার করিনি। প্রথমে পরিচিত হয়েছি। তারপর বন্ধুত্ব করেছি। সেই বন্ধুত্ব তার প্রতি কেয়ারিং দায়িত্ব পালন করেছি। সেই কেয়ারিংয়ের কারনে আমার প্রতি মিলির দুর্বলতা তৈরি হয়েছে। এরপর একদিন তাকে প্রেমের প্রস্তাব দেই, সে রাজি হয়ে যায়। যদিও সে এখনও প্রতিদিনই বলছে, তাকে যতজন প্রস্তাব করেছে, তার মধ্যে আমি সবচাইতে অসুন্দর। কিন্তু তারপরও আমার প্রতি সে দুর্বল হয়ে পড়ার কারনে সে আমার প্রেমের প্রস্তাবে অরাজি থাকতে পারেনি।”

গল্পটা এখানেই শেষ। একটি প্রেমের গল্পের মাধ্যমে আশা করি, সেলস ফানেলের গুরুত্ব বুঝাতে পেরেছি। যত ভাল সার্ভিস কিংবা প্রোডাক্টই আপনি নিয়ে আসুন না কেন, পাবলিকের সাথে সখ্যতা গড়ার আগেই যদি তার কাছে প্রোডাক্ট কিংবা সার্ভিস বিক্রির অফার করেন, তাহলে সেটাতে ইন্টারেস্ট কম অনুভব করে। অনেক সময় উল্টো ঘটনাও ঘটে। ক্রেতা আপনাকে দেখলেই লুকানো সম্ভব রয়েছে।

সেলস ফানেল কি? সব ক্ষেত্রেই সফলতার সিক্রেট লুকিয়ে আছে এই সেলস ফানেলে (১ম পর্ব)

সেলস ফানেল ছাড়া কি মার্কেটিং করা সম্ভব নয়?

ভাল মার্কেটাররা সকল সময়ই মার্কেটিং পরিকল্পনার সময় সেলস ফানেল ডিজাইন করে। তাতে ইনকাম সব সময় ঠিক থাকে, একটা পযায়ে পরিশ্রম কমে যায়, কিন্তু ইনকাম বেশি হয়।

তবে অনেকেই মার্কেটিংয়ের বিষদ না জেনেই মার্কেটিংয়ের বিভিন্ন টুলসে (সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং, ভিডিও মার্কেটিং, ইমেইল মার্কেটিং, ব্লগ মার্কেটিং ইত্যাদি) এক্সপার্ট হওয়ার কারনে তাদের মার্কেটিং পরিকল্পনাতে সেলস ফানেল ডিজাইনের চিন্তা মাথাতেই থাকেনা। কিন্তু এরপরও ইনকামের দিক দিয়ে সফল হচ্ছে। তাহলে বুঝা যাচ্ছে, সেলস ফানেল ছাড়াও কিছু কিছু ক্ষেত্রে সফল হওয়া সম্ভব।

কোন কোন ক্ষেত্রে সেলসফানেল ছাড়াও মার্কেটিংয়ে সফল হওয়া সম্ভব দেখে নিই:

–   যেসব সার্ভিস বা প্রোডাক্টের জন্য খরচ করতে মানুষ খুব বেশি চিন্তা করেনা, অর্থাৎ খুব সহজেই প্রোডাক্ট বা সার্ভিস কিনতে সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন, সেগুলোর ক্ষেত্রে সেলস ফানেল ছাড়াও সফল হওয়া যায়। যেমন: সিগারেট, টি-শার্ট, চাল, ডাল, কলম, ইত্যাদি বিভিন্ন দৈনন্দিন ব্যবহৃত জিনিস এবং কম দামী প্রোডাক্ট।

–   এ মুহুর্তে খুব বেশি চাহিদাসম্পন্ন হলে সেক্ষেত্রে সেলস ফানেল দরকার হয়না। যেমন: এ মুহুর্তে ক্রিকেট খেলা চলছে। এর টিকেটের চাহিদা অনেক বেশি। তাহলে এটি বিক্রি করতে সেলস ফানেলের দরকার নাই।

–   যে বাজারে বিক্রি করবেন, সেই বাজারে খুব জনপ্রিয় ব্রান্ড এটি। সেক্ষেত্রে সেলস ফানেল ছাড়াই ভাল বিক্রি হবে।

–   একদম যারা ১০০% কিনবে, সেই লিস্ট কারও কাছ থেকে পেয়ে গেছেন, সেক্ষেত্রে সেলস ফানেল দরকার নাই।

এসব ক্ষেত্রে সেলস ফানেল ছাড়াও সফল হলেও বড় বড় মার্কেটাররা এসব ক্ষেত্রেও সেলস ফানেল তৈরি করেন। কারণ লংটাইম সফলভাবে কাজ করতে চাইলে সেলসফানেল ডিজাইন করে কাজ করলে সফলতা অনেক বেশি পাওয়া যায়।

সেলস ফানেল কি? সব ক্ষেত্রেই সফলতার সিক্রেট লুকিয়ে আছে এই সেলস ফানেলে (১ম পর্ব)

কোন কোন ক্ষেত্রে সেলস ফানেল ছাড়া মার্কেটিং করাই উচিত না?

–   কোন প্রতিষ্ঠানের ব্রান্ডিংয়ের জন্য মার্কেটিং করলে।

–   যেসব সেবা বা প্রোডাক্ট কিনার ব্যাপারে খুব সহজে কেউ সিদ্ধান্ত নেয়না।

–   যার কাছে বিক্রি করবেন, তার জন্য এটি যদি ব্যয়বহুল হয়ে থাকে।

–   যেটি খুব জীবনের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ন না, পছন্দের কারনে কিনতে পারে।

–   একদমই নতুন প্রতিষ্ঠান হলে সেক্ষেত্রে সেই প্রতিষ্ঠানের সার্ভিস বা পণ্য বিক্রির মার্কেটিংয়ে

–   পণ্য বা সার্ভিসটির ব্যাপারে বাজারে নেগেটিভ ধারণা থাকলে,সেটির মার্কেটিংয়ে

–   যে বাজারে বিক্রি করবেন, সেখানের কম্পিটিশন খুব বেশি থাকলে

–   যে সার্ভিসটি বাজারে তুলনামূলক কম মূল্যে অন্য কেউ বিক্রি করছে, সেই বাজারে

এ পয়েন্টটিতে একটি কথা বলে পয়েন্ট শেষ করে দিচ্ছি। যেকোন কিছুর মার্কেটিংয়ের ক্ষেত্রে মাথাতে রাখতে হবে। আপনার সম্ভাব্য বাজারে ৩শ্রেনীর সম্ভাব্য ক্রেতা রয়েছে।

১ম শ্রেনী: সেবা বা পণ্যটি লাগবেই। সে শুধু খুজতেছে, কে সেই সেবাটি সেল করে। কে সেল করে খুজে পেলেই তার কাছ থেকে পন্যটি বা সার্ভিসটি কিনে নিতে প্রস্তুত। প্রোডাক্টের বিজ্ঞাপন তার চোখে পৌছাতে পারলেই নিশ্চিত সেল পেয়ে যাবেন।

–   বাজারে এ শ্রেনী সর্বোচ্চ ১০%

২য় শ্রেনী: এ ধরনের কিছু লাগবে। কিন্তু আসলে সে নিজে এখনও পুরোপুরি কনফার্ম না, আসলে সে কি খুজছে? সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন, লোভনীয় বিজ্ঞাপন এবং প্রতিষ্ঠানের ব্যপারে আস্থা তৈরি করাতে পারলে  এ শ্রেনীকে ক্রেতাতে রুপান্তর করা সম্ভব।

–   বাজারে এ শ্রেনী সর্বোচ্চ ৩০%

৩য় শ্রেনী: এ শ্রেনীতে ফেলবো ৩ধরনের মানুষকে:

ক) যাদের এ সার্ভিস কিংবা পণ্য সম্পর্কে কোন ধারণাই নাই।

খ) যারা সার্ভিসটি সম্পর্কে যানে কিন্তু কোন ধরনের একবিন্দুও কিনার আগ্রহ নাই

গ) যাদের এ সার্ভিস বা প্রোডাক্টটি সম্পর্কে সম্পূর্ণ নেগেটিভ ধারনা রয়েছে।

এ শ্রেনীর মানুষদেরকে ক্রেতাতে রূপান্তরিত করতে অনেক পরিকল্পিত সেলসফানেল ডিজাইন করতে হয়। সেলস ফানেল তৈরি ছাড়া এ শ্রেনীর মানুষদেরকে কখনও ক্রেতাতে কনভার্ট করতে পারবেননা।

–   বাজারে এ শ্রেনী  ৬০%

সেলস ফানেল কি? সব ক্ষেত্রেই সফলতার সিক্রেট লুকিয়ে আছে এই সেলস ফানেলে (১ম পর্ব)

আজকের মত এখানেই শেষ করছি। ও ভাবছেন, এত কিছু এতক্ষন বক বক করে গেলাম। আসল কথাই না জানিয়ে লিখা শেষ করে দিচ্ছি কেন? বুঝেছি, কি চাচ্ছেন, সেলস ফানেলটা কিভাবে ডিজাইন করবেন? সেলস ফানেলের গুরুত্বটা আগে পুরোপুরি মনের ভিতরে ঢুকানোর চেষ্টা করুন। এরপর পরের পর্বে কিছু সেলসফানেল ডিজাইন করার ব্যপারে আইডিয়া দিবো, সেই সাথে কিছু মার্কেটিং পরিকল্পনার সেলস ফানেলে ব্যপারেও কিছু কেস স্টাডি শেয়ার করবো্।

তার আগে আপনাদের কমেন্ট আশা করছি। আপনারা যদি কমেন্ট করেন, যে সেলস ফানেল সম্পর্কে বুঝেছেন, গুরুত্বও বুঝছেন। গুরুত্ব বুঝার কারনেই জানতে চাচ্ছেন, কিভাবে সেলস ফানেল ডিজাইন করেন। এটা আপনাদের কাছ থেকে জানতে পারলেই পরের পর্ব তাড়াতাড়ি নিয়ে আসবো। না হলে পরের পর্বটি আসতে দেরী হবে।

Comments (No)

Leave a Reply