ভাইরাল যেন ভাইরাসে পরিণত না হয়

কোনো ব্যক্তি, কোনো বিষয়ের অনুমতি বা স্বত্ব ছাড়া তার সম্পর্কিত ছবি, ভিডিও বা কোনো তথ্য অন্যদের কাছে ছড়িয়ে দেওয়াই ভাইরাল। ইন্টারনেটে কোনো বিষয় দ্রুত জনপ্রিয় হওয়া। ২০১৭ সালে গুগল, ইউটিউব, ফেসবুকে সবচেয়ে বেশি যে শব্দগুলো ব্যবহৃত হয়েছে, ভাইরাল শব্দটি সেগুলোর মধ্যে একটি। গুগল ট্রান্সলেটরে যার আভিধানিক অর্থ ভাইরাস ঘটিত এবং ব্যবহারিক অর্থ বিষপূর্ণ, বিষাক্ত, দূষিত, দুষ্টু। আজকাল সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে ভাইরাল শব্দটি প্রচুর ব্যবহৃত হচ্ছে। নকোনো তারকার বিয়ের ছবি থেকে শুরু করে হিলারি ক্লিনটনের গোপন ফোনালাপ পর্যন্ত সব কিছুই আজকাল ভাইরাল হয়ে যাচ্ছে।

কোনো ছবি, ভিডিও বা লেখা অনলাইনে বানের মতো প্রচার হলে আমরা সেটাকে বলি ভাইরাল। এই ছবি, ভিডিও বা লেখাগুলো অনেক সময় বানের তোড়ে ভেসে যায়। কোনো কোনোটি স্রোত থেকে বেরিয়ে স্থায়ী আসন গাড়ে। এর কোনো কোনোটি সমাজে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। কিছু ভাইরাল বিষয় স্রেফ আনন্দ দিয়ে যায়, কোনোটি ভাবায় কিংবা কাঁদায়। আজকাল ভাইরাল করা অনেকটা ট্রেন্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অনেকে শুধু পপুলার হওয়া বা খ্যাতি পাওয়ার জন্য নিজেই নিজের ভাইরাল ভিডিও সৃষ্টি করছে। তবে আমাদের সমাজে ভাইরাল শব্দটি অনেকটা নেতিবাচক অর্থে ব্যবহৃত হচ্ছে। কেউ একটা খারাপ জিনিস করলেই সেটা সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ভাইরাল করে দিচ্ছে।

অন্যের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে এসে তার সম্পর্কে গোপন তথ্য ভাইরাল করে দিচ্ছে। এমনকি আত্মহত্যার মতো বিষয়টি আজকাল ভিডিও আকারে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ভাইরাল হচ্ছে। এ তো গেল একশ্রেণি যারা অন্যের দ্বারা ভাইরালের স্বীকার হচ্ছে। আরেক শ্রেণি রয়েছে যারা নিজেরাই নিজেদের ভিডিও ভাইরাল করছে শুধু খ্যাতি পাওয়ার জন্য। এর মাধ্যমে শুধু যে তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নেগেটিভ ব্যবহার করছে তাই নয়, নিজেরাই নিজেদের বিপদ ডেকে আনছে। অনেকেই নিজের আবেগকে সামলাতে না পেরে এমন সব কাজ করছে, যা আইন ভঙ্গ করছে। যা পরবর্তী সময়ে তার ব্যক্তিক ও সামাজিক জীবনে প্রভাব ফেলছে।

ভাইরাল যে শুধু নেগেটিভ হতে হবে তা কিন্তু নয়। বর্তমান যুবসমাজ অনেক বেশি সচেতন। তারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কাজ করার নতুন মাধ্যম সৃষ্টি করেছে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোকে। যেখানেই অন্যায় দেখছে তা ভিডিও করে বা ব্লগিংয়ের মাধ্যমে ভাইরাল করে দিচ্ছে। যার কারণে সমগ্র জাতির মধ্যে এক ধরনের সচেতনতা সৃষ্টি হচ্ছে। তাই কোনো কিছু ভাইরাল করার আগে তার পজিটিভ-নেগেটিভ দুটো দিকই বিবেচনায় আনতে হবে। এক যুগ আগেও ভাইরাল শব্দটি ছিল আতঙ্কের কারণ। ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম ভাইরালকে দিয়েছে ইতিবাচক ভাবমূর্তি। অনেকেই এখন ভাইরাল হতে চান। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো ভাইরাল হওয়ার জন্য খোঁজে নানা উপায়। মুদ্রার উল্টো দিকও আছে; অনলাইনে ভাইরাল হওয়ার কারণে অনেকের জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ, ছড়ায় ভুল তথ্য।

বাংলাদেশের বর্তমান আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে সহিংসতা হয়ে উঠেছে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। পারস্পরিক দ্বন্দ্ব রূপ নিচ্ছে সংঘাতে, ব্যক্তিজীবনের ক্ষুদ্র কোনো ঘটনা সহিংসতায় রূপ নিয়ে প্রাণ যাচ্ছে অনেকের। আবার সহিংস কর্মকা- খুব দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ছে অনলাইন সংবাদ মাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
জনমানুষের মধ্যে ভালোভাবেই আলোড়িত হয় এসব সহিংসতা। গবেষণায় দেখা গেছে, সহিংস সংঘাত, মনন মানসিকতার ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে, অর্থাৎ এসব সহিংস ঘটনা যত বেশি আমাদের সামনে আসে, আমরা ততই এর প্রতি এক ধরনের আসক্তি কিংবা ভীত হয়ে পড়ি।

নেতিবাচক এমন হাজারো ছবি, ভিডিও বা লেখা আছে ইন্টারনেটে। অনলাইনে ব্যক্তিগত নিরাপত্তাই এর অন্যতম সমাধান। সবচেয়ে বড় কথা হলো, ভাইরাল মানেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেহেতু কোনো স¤পাদক নেই, যা ইচ্ছা তাই শেয়ার করা যায়। অতএব নিশ্চিত না হলে যাচাই করে নেওয়াই উত্তম।

Comments (No)

Leave a Reply