একুরিয়ামে মাছ পালনের মাধ্যমে আয়

বাসাবাড়ি কিংবা অফিসের ভেতরের শোভা বৃদ্ধির জন্যে বহুকাল যাবৎ পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশের মানুষেরও একুয়ারিয়ামে মাছ রাখার কিংবা মাছ পালবার একটা শখ ছিল। বহুদিনের এই শখটি এখন একটি প্রতিষ্ঠিত বাণিজ্যে রূপ নিয়েছে। এখন একুয়ারিয়াম শুধুই একটি কাচের আধার    নয়, এটি একটি উপার্জনের উৎসও বটে। কথা হচ্ছিল ঢাকার গোপীবাগের সোহেলের সাথে। সোহেল এখন বাহারি মাছের একজন ব্যবসায়ী। ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত পড়াশোনা করে সামাজিক অবক্ষয়ের স্রোতে ভাসিযে দিয়েছিল সোহেল নিজেকে, কিন্তু বাহারি মাছ তাকে নতুন পথের সন্ধান দিয়েছিল। শখের বসে সোহেল বহুদিন আগে থেকেই বাহারি মাছ পালত। হঠাৎ একদিন লক্ষ্য করল একটি গোল্ডফিশ অনেকগুলো বাচ্চা দিয়েছে।  এই গোল্ডফিশই সোহেলের ভাগ্য ফিরিয়ে দিল। বাহারি মাছ পালার শখটি বাহারি মাছ চাষে রূপান্তরিত হয়ে গেল। গোল্ডফিশের বাচ্চাগুলো সে ঢাকার কাঁটাবন মসজিদ সংলগ্ন বাহারি মাছের বাজারে বিক্রি করে কিছুটা মুনাফা পেল। এ থেকে গুরু হল তার পরিবর্তন। এখন সে একজন বাহারি মাছের পোনা উৎপাদক বা ব্রীডার। মাসে তার  দশ থেকে বারো হাজার টাকা আয় হয়। সে এখন সমাজে প্রতিষ্ঠিত একজন যুবক। কাঁটাবন মসজিদ সংলগ্ন বাহারি মাছের বাজারে সোহেলের একটি দোকানও রয়েছে।

সোহেলের মতো এমন আরও কয়েকজনের সাথে পরিচয় ঘটল যারা বাহারি মাছ ব্যবসার সাথে জড়িত। তালুকদার এদের একজন। ঢাকার হাতিরপুল এলাকায় তার নিজ বাড়িতে বাহারি মাছের এক বিশাল হ্যাচরি দেখে এ মাছ ব্যবসায় বাংলাদেশ কতদূর এগিয়ে গেছে তা অনুধাবন করতে পারলাম। সবচেয়ে ভালো লাগার ব্যাপার হল, এক্ষেত্রে যতটুকু উন্নয়ন ঘটেছে তার পুরোটাই প্রাইভেট সেক্টর বা ব্যক্তি উদ্যোগে। তালুকদার সাহেবই এদেশে সর্বপ্রথম বাহারি মাছ আমদানি করেছিলেন। আবার তিনিইি সর্বপ্রথম এদেশ থেকে বাহারি মাছ রফতানি করলেন ‘৯২-এ। এখন বাংলাদেশ নিয়মিত বাহারি মাছ রফতানি করে। বাংলাদেশ থেকে জার্মানিতেই সবচেয়ে বেশি বাহারি মাছ রফতানি হয়। এখানে একটি মজার ব্যাপার হল-  ক্ষেত্রবিশেষে পৃথিবীর অন্য প্রান্তের বা দেশের টেবিল ফিশ আমাদের দেশে কাচের আধারে বাহারি মাছ হিসাবে গণ্য হয়। আবার আমাদের দেশের টেবিল ফিশ যেমন- টেংরা, পুঁটি, বাইন, গুতুম, টাকি, খলিসা, মেনি- এগুলো ইউরোপের বাজারে অত্যন্ত আকর্ষণীয় একুয়ারিয়াম ফিশ হিসাবে চাহিদা রয়েছে। অনেকে আছেন সোহেলের মতো মাছ পালতে পালতে ব্যবসায়ী হয়েছেন। যেমন- ঘরে একুয়ারিয়াম আছে, মাছ বড় হচ্ছে, বাচ্চা দিচ্ছে। এগুলো বিক্রি করছে। এতে বাড়তি কিছু আয় আসছে, মন্দ কি! অনেকটা মাছের তেলে মাছ ভাজারই মত।যা হোক, একুয়ারিয়ামে কিভাবে মাছ পালবেন, কোথায় একুয়ারিয়াম সাজাবেন, মাছকে কী খাবার দেবেন-সে সম্পর্কে এখন বলছি : একুয়ারিয়ামের বিভিন্ন আকার রয়েছে। ঘরে রাখার জন্য ২৪”×১২”×১২” একুয়ারিয়ামই উপযুক্ত। একুয়ারিয়ামের ফ্রেমগুলো মজবুত ধাতব পদার্থের তৈরি এবং চতুর্পাশ্বে ও তলার কাচ অন্তত ০.২৫” পুরু হওয়া প্রয়োজন।

একুয়ারিয়ামের মাছ রাখার জন্য নিম্নোক্ত কাজগুলো পর্যায়ক্রমে করতে হবে

>পরিষ্কার থিতানো পানি দিয়ে একুয়ারিয়ামের ভেতরে এবং বাইরে পরিষ্কার করে নিতে হবে।

>কখনও সাবান বা অন্য কোন ডিটারজেন্ট ব্যবহার করা যাবে না। তবে লবনের ঘন দ্রবণ ব্যবহার করা যেতে পারে।

>  পরিষ্কার মোটা দানার বালি সংগ্রহ করে উপরে বর্ণিত পানি দিয়ে ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে।

> ধৌত করা বালি একুয়ারিয়ামের তলদেশে ৪ ইঞ্চির মতো গভীর করে ভালোভাবে বসাতে হবে।

>  পানি ভর্তি করার আগে একুয়ারিয়ামকে বাড়ির নির্দিষ্ট স্থানে সেট করতে হবে । সেট করার সবচেয়ে উত্তম জায়গা হল ঘরের উত্তর সাইডের জানালা  যেখানে দিনে আশিংক সূর্যালোক পড়ে।
>  এবার থিতানো ক্লোরিনমুক্ত পানি দ্বারা একুয়ারিয়াম পূর্ণ করতে হবে। পানির উপরিতল একুয়ারিয়ামের উপরিতল থেকে ৩ ইঞ্চি বা ৪ ইঞ্চির মতো নিচে হতে হবে।
>  জলজ উদ্ভিদ বালির মধ্যে লাগাতে হবে এবং সুন্দর  নুড়িপাথর/ছোট পাথরের টুকরা দ্বারা গাছের গোড়াকে ঢেকে দিতে হবে। নানা ধরনের জলজ  উদ্ভিদই একুয়ারিয়ামে রোপন করা যায়। এ ব্যাপারে শালুক, ঝাঁজি, ঝাউঝাঁজি, পাতা কাটা শেওলা, জলজ পদ্ম, শাপলা ইত্যাদি জলজ উদ্ভিদগুলো ব্যবহার করা যেতে পারে।

মাছ ছাড়া

একুয়ারিয়ামের বেশিসংখ্যক মাছ ছাড়ার চেয়ে অল্পসংখ্যক সুন্দর সুস্থ ও সবল মাছ ছাড়াই উত্তম। নিয়মানুযায়ী ১ ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের মাছের জন্য প্রায় ১ গ্যালন পরিমাণ পানির প্রয়োজন। সেই হারে ২৪ ইঞ্চি  ১০ ইঞ্চি  ১২ ইঞ্চি মাপের একুয়ারিয়ামে ১/১.৫ ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের এক ডজন মাছ অনায়াসেই স্বাভাবিক ভাবে বেঁচে থাকতে পারে এবং এদের শ্বাসকার্যের ব্যাঘত ঘটতে দেখা যায় না। আমাদের দেশীয় মাছের মধ্যে বউ মাছ, রঙিন খলিসা, চিংড়ি, পুঁটি, টেংরা, চান্দা, কানপোনা, বেলে, মলা, কই, মাগুর ইত্যাদি এবং বিদেশি মাছর মধ্যে  সোর্ড টেইল, মলি, প্লাটি, এনজেল, জেরা, রঙিন তেলাপিয়া ইত্যাদি মাছ একুয়ারিয়ামে ছাড়া যেতে পারে।

মাছের খাদ্য
বাজারে একুয়ারিয়ামের  মাছের বিভিন্ন ধরনের খাবার পাওয়া যায়। এগুলো মাছের দেহের ওজনের ৫% করে সকালে ও বিকালে দুবার খাওয়ানো যেতে পারে। এছাড়া ফিশমিল ও ভূষি ১:২ অনুপাতে একত্রে অল্প পানিতে মিশিয়ে ছোট ছোট দানা করে একটা বাটিতে রেখে একুয়ারিয়ামের তলায় রাখতে হবে। অনেক সময় কেঁচো, টিউবিফিক্স, ভাত ইত্যাদি খাবার হিসাবে ব্যবহার করা যায়। খাবার সমস্ত জায়গায় না ছিটিয়ে নির্দিষ্ট ২ বা ৩ জায়গায় দিতে হবে।

প্রতিদিন ২ বা ৩ ঘন্টার জন্য সূর্যকিরণে একুয়ারিয়াম রাখা উত্তম। তবে অপরিহার্য নয়। এর ঢাকনার ভেতর দিকে থেকে টিউব লাইট এর আলো দ্বারা একুয়ারিয়ামকে আলোকিত করা যায়। পর্যাপ্ত আলোর প্রভাবে একুয়ারিয়ামকে আরও মনোরম দেখায়। এ ব্যাপারে ৬০ ওয়াটের ইলেকট্রিক বাল্ব ব্যবহার করা যেতে পারে। আগেই বলেছি, বাংলাদেশে বাহারি মাছ আজ যে পর্যায়ে এসেছে। তার পুরোটাই ব্যক্তি উদ্যোগে, এর তেমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেই। কেউ যদি এ বিষয়ে পরামর্শ বা নির্দেশনা চান তবে তো দেয়া সম্ভব হয় না। আমি ব্যক্তিগতভাবে দেখেছি যে, একুয়ারিয়ামের  মাছের উপর টিভি অনুষ্ঠান প্রচারের পর উল্লেখ যোগ্যসংখ্যক চাহিদা আসা সত্ত্বেও তার সমাধান দেয়া সম্ভব হয়নি। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বগুড়া, যশোহর সহ বড় বড় শহরে একুয়ারিয়াম ফিশের ছোট-বড় মার্কেট আছে ঠিকই, কিন্তু এগুলো একেবারেই নিজেদের চেষ্টায় দাঁড়িয়েছে। এই ক্ষেত্রটিতে একটা বড় সম্ভাবনা রয়েছে, যা উদ্যোক্তারা প্রমাণ করছেন। সে ক্ষেত্রে সরকার চাইলে এ বিষয়টিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারে।

তথ্য সূত্র: শাইখ সিরাজ রচিত ‘মাটি ও মানুষের চাষবাস’ গ্রন্থ থেকে
তথ্য ও সূত্র অনলাইন
সংগ্রহীত

Comments (No)

Leave a Reply