বেকারি ব্যবসা শুরু করবেন কিভাবে?

বেকারি ব্যবসা শুরু করবেন কিভাবে? 1

বেকারি ব্যবসা শুরু করবেন কিভাবে? বেকারি ব্যবসা একটি উৎপাদনমুখী ব্যবসার আইডিয়া। উৎপাদনমুখী ব্যবসা শুনে আপনি বুঝতেই পারছেন এখানে আপনাকে পণ্য উৎপাদন করতে হবে। পণ্য উৎপাদন ব্যবসা যেমন লাভজনক তেমন চ্যালেঞ্জিং। কারণ আপনি যদি নিজের পণ্য দিয়ে মার্কেট দখল করতে পারেন তাহলে আপনি ব্যাপক লাভবান হবেন অন্যদিকে আপনার পণ্য যদি মান সম্পন্ন না হয় তাহলে প্রতিযোগিতায় আপনি টিকে থাকতে পারবেন না।

বেকারি ব্যবসা শুরু করবেন কিভাবে? 2

বেকারি পণ্য হচ্ছে মুখরোচক খাবার। প্রায় প্রতিটি পরিবার প্রতিদিন কিছু না কিছু বেকারি আইটেম ক্রয় করে থাকে। সকালের নাস্তায় পাউরুটি বা বিকেলের চায়ের সাথে বিস্কুট এগুলো আমাদের সমাজে পরিচিত দৃশ্য। এছাড়া শ্রমজীবী মানুষ বেকারি পণ্যের অন্যতম ক্রেতা।

আপনারা রাস্তায় বের হলেই দেখবেন রিকশাওয়ালাসহ বিভিন্ন শ্রমজীবী মানুষ টং দোকানে বসে পাউরুটি বিস্কুট ইত্যাদি বেকারি পণ্য খাচ্ছে। এদের কথা বললাম কারণ আপনি যেহেতু বেকারি ব্যবসা শুরু করবেন তাই আপনাকে আপনার টার্গেট গ্রাহক সম্পর্কে জানতে হবে এবং সেভাবে ব্যবসার কৌশল ঠিক করে মার্কেটিং করতে হবে।

বেকারি পণ্যের তালিকা

বেকারি ব্যবসা শুরু করার আগে আপনাকে প্রথমেই বেকারি পণ্যের তালিকা সম্পর্কে জানতে হবে। কারণ আপনি যদি বেকারি আইটেম সম্পর্কে না জানেন তাহলে বেকারি ব্যবসা করবেন কিভাবে? বেকারি পণ্যের তালিকা –

  • পাউরুটি
  • বিস্কুট
  • চানাচুর
  • পেটিস
  • কেক
  • টোস্ট
বেকারি ব্যবসা শুরু করবেন কিভাবে? 3

বেকারি আইটেমের মধ্যে সাধারণত এগুলোই তৈরি করে থাকে। তবে আপনি প্রতিটি বেকারি আইটেমের মধ্যে বৈচিত্রতা আনতে পারেন। যেমন সাধারণ পাউরুটি, মোরব্বা দিয়ে মিষ্টি পাউরুটি, মিল্ক পাউরুটি, বিস্কুটের মধ্যে বিভিন্ন সাইজের এবং স্বাদের বিস্কুট বানাতে পারেন, কেকের মধ্যে বানাতে পারেন ড্রাই কেক, ফ্রুট কেক, টোস্টের মধ্যে আছে ঝাল টোস্ট এবং মিষ্টি টোস্ট ইত্যাদি।

বেকারি ব্যবসা করতে যেসব কাঁচামাল লাগবে

বেকারি আইটেম তৈরি করার জন্য আপনাকে বিভিন্ন ধরণের কাঁচামাল লাগবে। এসব কাঁচামালের মধ্যে রয়েছে –

  • ময়দা
  • চিনি
  • তেল
  • মাখন
  • ডালডা
  • বেকিং পাউডার
  • বেকিং সোডা
  • কাস্টার্ড পাউডার

বেকারি ব্যবসা শুরু করার জন্য যেসব মেশিন লাগবে

বেকারি ব্যবসা শুরু করার জন্য আপনার বিভিন্ন ধরণের মেশিন লাগবে। এসব বেকারি মেশিনের মধ্যে রয়েছে –

  • মিকশ্চার মেশিন
  • ওভেন
  • বিশেষ ধরনের টেবিল
  • পাতা মেশিন ( এখানে বিস্কুট কেটে রাখা হয়)
  • ডো মেকিং মেশিন (ময়দা মাখার মেশিন)
  • ডাইস
  • প্যাকেজিং মেশিন

মিকশ্চার মেশিন ব্যবহার করা হয় ময়দা প্রসেসিং করার জন্য। আপনার যদি পুঁজি কম থাকে। তাহলে আপনি এই মেশিন না কিনে হাতেও ময়দা প্রসেসিং এর কাজ করতে পারেন ।

বেকারি ব্যবসা শুরু করবেন কিভাবে? 4

ইলেকট্রিক ওভেনের ভেতর বেকারি আইটেম রেখে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সেগুলোকে প্রক্রিয়াজাত করা হয়।

ডাইস হচ্ছে এমন মেশিন যার মাধ্যমে বিস্কুট, পেটিস, কেক ইত্যাদির বিভিন্ন ধরণের ডিজাইন করা হয়।

এসব বেকারি মেশিন এছাড়া আপনার কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপর লাগবে। যেমন-কেক বানানোর জন্য ছাঁচ লাগবে, ছুরি এবং বিশেষ ধরণের কাগজ। আবার পাউরুটি বানাতে আপনার ছাঁচ এবং ব্রাশ লাগবে।

বেকারি ব্যবসা শুরু করতে কেমন পুঁজি লাগবে?

যে কেউ বেকারি দেওয়ার আগে অবশ্যই জানতে চাইবেন বেকারি ব্যবসা শুরু করতে কেমন পুঁজি লাগবে। সাধারনভাবে বললে বলা যায় একটি বেকারি ব্যবসা শুরু করতে ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা পুঁজি লাগে। তবে এখানে অনেক ব্যাপার আছে।

বেকারি ব্যবসা শুরু করার জন্য আপনাকে একটি কারখানা ভাড়া নিতে হবে। একেক যায়গায় ভাড়া একেক রকম। শহরের জমজমাট স্থানে হলে ভাড়া অনেক বেশি আবার গ্রামে বা শহরতলীতে ভাড়া অনেক কম। আবার আপনি যতি নিজের বাড়িতে কারখানা স্থাপন করেন তাহলে আপনার কারখানা ভাড়া নেওয়ার খরচ বেঁচে যাবে।

সবচেয়ে বেশি খরচ হয় বেকারি মেশিন ক্রয় করার পেছনে। বেকারি মেশিনের দাম যথেষ্ট বেশি। সবচেয়ে বেশি দাম হচ্ছে ইলেকট্রিক ওভেনের। একটি ওভেনের দাম ১ লাখ টাকা থেকে শুরু করে প্রায় থেকে পৌনে চার লাখ টাকা পর্যন্ত দামের ওভেন আছে। তবে মান এবং দোকান ভেদে দামের তারতম্য হয়ে থাকে। একটা মিকশ্চার মেশিনের দাম ৪৫ হাজার থেকে শুরু করে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত আছে। এছাড়া অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও আপনাকে ক্রয় করতে হবে।

বেকারি ব্যবসায় মূল খরচ যেহেতু বেকারি মেশিন কেনায় হয় তাই এই ব্যবসা শুরু করার আগে বেকারি মেশিনের দাম সম্পর্কে ভালভাবে জেনে নিতে হবে।

কিভাবে বেকারি ব্যবসা শুরু করবেন?

বেকারি ব্যবসা একটিলাভজনক ব্যবসা। এই লাভজনক ব্যবসা যে কেউ শুরু করতে পারে। এই ব্যবসা শুরু করার আগে আপনাকে অবশ্যই মার্কেট নিয়ে কিছু গবেষণা করতে হবে। আপনি যে যায়গায় এই ব্যবসা দিতে চাচ্ছেন সে যায়গার আশেপাশে অন্য কেউ বেকারি আইটেমের ব্যবসা করে কিনা তা আপনাকে দেখতে হবে। যদি আশেপাশে কোন প্রতিষ্ঠিত বেকারি প্রতিষ্ঠান না থাকলে আপনি এই ব্যবসা শুরু করার জন্য পদক্ষেপ নিতে পারেন।

বেকারি ব্যবসা শুরু করবেন কিভাবে? 5

যদি আশেপাশে বেকারি ব্যবসা থাকার পরও সেখানে বেকারি কারখানা স্থাপন করেন তাহলে আপনাকে তাদের চেয়ে ভাল বেকারি আইটেম তৈরি করতে হবে। সার্ভিস দিবে হবে চমৎকার। তাহলে আপনি মার্কেট ধরতে পারবেন।

এই ব্যবসা শুরু করার জন্য আপনার একটি কারখানা লাগবে। আপনি যদি ছোট পরিসরে শুরু করতে চান তাহলে একটি রুম হলেই যথেষ্ট। আর যদি বড় পরিসরে শুরু করতে চান তাহলে একটি বড় যায়গা ভাড়া নিয়ে কারখানা দিতে পারেন। কারখানা ভাড়া নেওয়ার পর সেখানে বেকারি আইটেম তৈরি করার জন্য মেশিন স্থাপন করতে হবে। ইতিমধ্যে বেকারি মেশিনের দাম সম্পর্কে আপনারা জেনেছেন তাই সে অনুযায়ী আপনাকে পুঁজি সংগ্রহ করতে হবে।

বেকারি মেশিন কেনা হয়ে গেলে বেকারি আইটেম তৈরি করার জন্য আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী কিছু দক্ষ শ্রমিক নিয়োগ দিতে হবে। পূর্বে তারা বেকারি আইটেম তৈরি করার কারখানায় কাজ করেছে কিনা সেটা ভালভাবে যাচাই করে নিবেন।

বেকারি পণ্য ডেলিভারি দেওয়ার জন্য দুই তিনটি ভ্যান কিনতে হবে। সেগুলো দিয়ে আপনি বেকারি পণ্য বিভিন্ন দোকানে সাপ্লাই দিবেন।

বেকারি পণ্যের মার্কেটিং কিভাবে করবেন?

বেকারি ব্যবসায় সফল হতে হলে আপনাকে বেকারি পণ্যের মার্কেটিং খুব ভালভাবে করতে হবে। মার্কেটিং বলতে আমরা যা বুঝি তা হচ্ছে কোম্পানির পণ্য বা সেবা গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দিতে বিভিন্ন ধরণের কৌশল অবলম্বন করা। আপনাকেও বেকারি পণ্যের বাজারজাতকরণের জন্য বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করতে হবে।

বেকারি আইটেমের মার্কেটিং এর জন্য কিছু দক্ষ কর্মী নিয়োগ দিতে হবে যারা বিভিন্ন দোকান, সুপার শপ এবং রাস্তার পাশের ছোট টং দোকানগুলোতে আপনার বেকারি পণ্য পৌঁছে দিবে। এছাড়া আপনি অননাইলনেও প্রচার করতে পারেন। আপনার কারখানায় তৈরি করা বিভিন্ন বেকারি আইটেমের আকর্ষণীয় ছবি অনলাইনে প্রচার করতে পারেন। এর ফলে আপনি নিজের এলাকাসহ দূর দূরান্ত থেকেও অর্ডার পেতে পারেন।

বেকারি প্রশিক্ষণ

বেকারি ব্যবসা শুরু করার আগে আপনাকে অবশ্যই বেকারি প্রশিক্ষণ নেওয়া উচিৎ। কারণ বেকারি প্রশিক্ষণ ছাড়া আপনি ঠিকভাবে বেকারি পণ্য তৈরি করতে পারবেন না। যদি আপনি অন্য কারো কাছ থেকে বা অন্য কারখানায় কাজ করে হাতে কলমে শিখে থাকেন তাহলে তো কথা নেই। যদি পূর্বে অন্য কোন বেকারি কারখানা থেকে সরাসরি কাজ শেখার সুযোগ না হয়ে থাকে তাহলে বেকারি প্রশিক্ষণ নিয়ে নিন।

বেকারি প্রশিক্ষণের মধ্যে রয়েছে বেকারি আইটেম তৈরি করার নানা কৌশল, খাবার প্রক্রিয়াজাতকরণের নিয়ম, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

এসএমই ফাউন্ডেশন থেকে আপনি বেকারি প্রশিক্ষণ নিতে পারেন। এছাড়া Bakery and Pastry – PFDA – Vocational Training Center, Ucep-bangladesh, বাংলাদেশ হোটেল ম্যানেজমেন্ট এন্ড ট্যুরিজম ট্রেনিং ইনস্টিটিউট ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান থেকেও বেকারি প্রশিক্ষণ নিতে পারেন।

বেকারি ব্যবসায় কেমন লাভ?

আগেই বলেছি বেকারি ব্যবসা একটি লাভজনক ব্যবসা। বেকারি আইটেম বিক্রি করে আপনি প্রায় ৪০ শতাংশ লাভ করতে পারবেন। তার মানে আপনি যদি ১০০ টাকার পণ্য বিক্রি করেন তাহলে কমপক্ষে ৪০ টাকার মত মুনাফা থাকবে।

পরিশেষে

আশা করি বেকারি ব্যবসা সম্পর্কে আপনি ভাল একটি ধারণা পেলেন। কিভাবে বেকারি ব্যবসা শুরু করবেন, বেকারি পণ্যের তালিকা, বেকারি মেশিনের দাম, বেকারি প্রশিক্ষণ ইত্যাদি বিষয়ে যে ধারণা পেয়েছেন তা আপনাকে একটি বেকারি ব্যবসা শুরু করতে অনেক সাহস যোগাবে।

পরিশেষে একটা পরামর্শ দিয়ে লেখাটি শেষ করব তা হচ্ছে ওভেন ব্যবহার করার সময় তাপমাত্রার দিকে খেয়াল রাখবেন কারণ সহনীয় তাপমাত্রার বেশি তাপমাত্রা যদি আপনি সেট করেন তাহলে বেকারি পণ্য পুড়ে যেতে পারে আর পুড়ে যাওয়া জিনিস যেহেতু কেউ কিনতে চাইবে না তাই সেটা আপনার জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তাই এই ব্যাপারে একটু সাবধান থাকবেন।

Comments (No)

Leave a Reply

এই সাইটের কোন লেখা কপি করা সম্পুর্ন নিষেধ