কবুতর পালনে কোটিপতি

কবুতর বদলে দিয়েছে ঝিনাইদহের হরিণাকুন্ডু উপজেলার পারমথুরাপুর গ্রামের বাদশা আহমেদ দুদু মিয়ার ভাগ্য। কবুতর পালন করে কয়েক বছরের ব্যবধানে দুদু মিয়া আর্থিক সচ্ছলতা অর্জন করেছেন। সাত বছর আগে তিন জোড়া কবুতর নিয়ে তিনি বাণিজ্যিকভাবে গড়ে তোলেন কবুতরের খামার। এ খামারের আয় থেকে ক্রয় করেছেন জমি,গড়ে তুলেছেন পাকা বাড়ি ও ছাগলের খামার। বর্তমানে দুদু মিয়ার সম্পদের পরিমাণ প্রায় কোটি টাকা। দুদু মিয়া এখন বেকার যুবকদের অনুকরণীয়।

প্রতিদিনই দেশের দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসছে পারমথুরাপুর গ্রামে দুদু মিয়ার কবুতরের খামার দেখতে। তার খামারে রয়েছে বিদেশি ও বিলুপ্ত প্রজাতির চার শতাধিক কবুতর। দুদু মিয়া জানান, সাত বছর আগে চার হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে ময়ূরী ও
সিরাজি জাতের তিন জোড়া কবুতর দিয়ে বাণিজ্যিকভাবে কবুতর পালন শুরু করেন। ছেলে হৃদয়ের নামে কবুতর খামারের নাম রাখেন হৃদয় কবুতর খামার। বর্তমানে তার খামারে ৪০ প্রজাতি বিদেশি কবুতর রয়েছে। এর মধ্যে ৪০ হাজার টাকা জোড়া মূল্যের আফ্রিকার কেরিয়ার হুমার ও ১০ হাজার টাকা মূল্যের মডেনাও আছে। ৩০ হাজার টাকা মূল্যের হল্যাল্ডের লাল, কালো ও হলুদ কোটারবল, ১০ হাজার টাকা মূল্যের ব্লু কিং, ম্যাগপাই ও আওল এবং ৬ হাজার টাকা মূল্যের বিউটি হুমার। আছে ৬ থেকে ২০ হাজার টাকা মূল্যের পাকিস্তানি ব্লু সিরাজি, কালো কিং, লাল কিং, হলুদ কিং, হোয়াইট কিং, সাটিং, শ্যালো নান পারভিন, সিংহ ও হাইপিলার। ৬ হাজার টাকা মূল্যের অস্ট্রেলিয়ার কিং। ২ হাজার টাকা মূল্যের ভারতীয় বোম্বাই ও লোটন এবং দেশি সোয়াচন্দন জাতসহ বিলুপ্ত প্রজাতির ৪ শতাধিক বিদেশি কবুতর রয়েছে।

দুদু মিয়া জানান, তার খামারে থাকা বিদেশি কবুতরগুলোর বর্তমান বাজারমূল্য ১৫ লাখ টাকার ওপরে। দুদু মিয়া আর জানান, বিদেশি জাতের এসব কবুতর দেশের বিভিন্ জেলা থেকে যেমনÑ ঢাকা, রাজশাহী, খুলনা,নাটোর, পাবনা, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, রাজবাড়ী ও ফরিদপুর থেকে সংগ্রহ করেছেন। বর্তমানে তার খামারে উৎপাদিত বিদেশি জাতের কবুতরের বাচ্চা দেশের বিভিন্ন জেলার পাইকারদের কাছে ১ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা জোড়ায় বিক্রি করেন। দুদু মিয়া জানান, ২০ হাজার টাকা খরচ করে এক জোড়া বিদেশি কবুতর পুষলে বছরে সব খরচ বাদ দিয়ে ৩০ হাজার টাকা লাভ থাকে। তিনি বলেন, বছরে এক জোড়া কবুতর কমপক্ষে চার জোড়া বাচ্চা দেয়। প্রতি জোড়া বাচ্চার দাম ১০ হাজার টাকা। কবুতরের খাবার বাবত এক বছরে খরচ হয় ১৫ শ’ থেকে ২ হাজার টাকা। অন্যান্য খরচ ৪ হাজার টাকার মতো। এ হিসাবে খরচ বাদ দিয়ে ২০ হাজার টাকার এক জোড়া কবুতরে ৩০ হাজার টাকার ওপর লাভ থাকে। এভাবেই ৭ বছরে দুদু মিয়া কবুতরের খামারে উৎপাদিত বাচ্চা ও কবুতর বিক্রি করে উল্লেখযোগ্য আর্থিক পরিবর্তন আনতে পেরেছেন। কবুতরের খামারের আয় দিয়েই তিনি পারমথুরাপুর গ্রামে তৈরি করেছেন একতলা পাকা বাড়ি, কিনেছেন তিন বিঘা জমি।এছাড়াও দুদু মিয়ার রয়েছে ৪০টি ছাগল, দুটি গরু ও শতাধিক মুরগি। সব মিলিয়ে দুদু মিয়ার সম্পদের পরিমাণ প্রায় কোটি টাকা।

শুরুর কথা: দুদু মিয়া অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন পিতার আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে নবম শ্রেণীতে ভর্তি হতে পারেননি। অভাবের সংসারে আর্থিক সচ্ছলতা আনার আশায় দুদু মিয়া অষ্টম শ্রেণী পাস করে কাঁধে তুলে নেন
লাঙল আর জোয়াল। অন্যের জমি বর্গা নিয়ে তিনি শুরু করেন কৃষিকাজ। কিন্তু কৃষি কাজে সফলতা না আসায় শুরু করেন
মুরগি কেনাবেচার ব্যবসা। নিজ এলাকার বিভিন্ন বাড়ি থেকে মুরগি কিনে এনে তিনি ঝিনাইদহ শহরে বিক্রি শুরু করেন। এ ব্যবসায় কিছুটা সফলতা আসায় তিনি আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে মুরগি কিনে এনে ঝিনাইদহ শহরের বিভিন্ন হোটেল-রেস্তোরাঁয় সরবরাহ করতে থাকেন।

মুরগির ব্যবসার এক পর্যায়ে তার গ্রামের রিকশাচালক আইয়ুব মিয়ার কাছে জানতে পারেন কুষ্টিয়ার জেলখানা রোডের নাজমুল হোসেনের কাছে কিছু বিদেশি প্রজাতির কবুতর আছে। এই খবরে দুদু মিয়া কুষ্টিয়ায় গিয়ে নাজমুলের কাছ থেকে ৪ হাজার টাকা দিয়ে তিন জোড়া কবুতর কিনে আনেন। এ সময় তিনি জানতে পারেন নাজমুল হোসেন শৌখিনতার কারণে বিদেশি কবুতর পোষেন। মূলত নাজমুল হোসেনের কবুতর পোষা দেখেই দুদু মিয়ার
কবুতর পালনের প্রতি আগ্রহ জন্মে এবং তিনি বাণিজ্যিকভাবে কবুতর পালনের পরিকল্পনা নেন।

এক ছেলে হৃদয় এবং দুই মেয়ে স্মৃতি ও মহিমাকে নিয়ে পাঁচ সদস্যের সংসার দুদু মিয়ার। ছেলেমেয়েদের উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলাই দুদু মিয়ার স্বপ্ন। তার সন্তানরা যেন সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে। তাছাড়া দুদু মিয়া বেকার তরুণদের স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন।

তিনি তার এলাকায় বেকার তরুণদের ছোট ছোট কবুতরের খামার গড়ে দিচ্ছেন। তরুণরা যেন বেকার না থেকে অল্প পুঁজি নিয়েই ছোট ছোট উদ্যোগ গ্রহণ করে এটাই তরুণদের প্রতি দুদু মিয়ার পরামর্শ। অর্জন একজন সফল কবুতর উৎপাদনকারী হিসেবে দুদু মিয়া ২০০৮ সালে ও ২০১৩ সালে ঝিনাইদহের শ্রেষ্ঠ কবুতর উৎপাদক হিসেবে জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে টাকা ও সনদ অর্জন করেছেন।

দুদু মিয়ার কবুতর পালনের এই সাফল্য দেশের বেকার যুবকদের কাছে অনুকরণীয় হতে পারে। তার দেখাদেখি বেকার যুবকরা যদি কবুতর পালন পেশায় এগিয়ে আসেন, তাহলে তারা স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও অবদান
রাখতে পারবে। কবুতর পালনে এগিয়ে আসার জন্ দুদু মিয়া এলাকার বেকার যুবকদের বুদ্ধি ও পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করছেন।

Comments (No)

Leave a Reply